বাউলুরি

কাপুরুষ

এক

পার্কের বেঞ্চীতে বসে আছে ফাহিম। হুয়ার জন্য অপেক্ষা । হুয়া চীনদেশের মেয়ে। তাঁরা একই ক্লাসে পড়ে। হুয়া এলে, তাঁরা এক সাথে লাইব্রেরীতে যাবে। ক্লাসের প্রোজেক্ট জমা দেবার শেষ দিন ঘনিয়ে আসছে। লাইব্রেরীতেই তাঁদের দেখা হতো পারতো। কিন্তু হুয়া আজ  ড্রাইভ করছে । সে বলেছে, ফাহিমকে  বাসার কাছের পার্ক থেকে তুলে নিয়ে যাবে।

ফাহিম অনেক আগেই বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে।  বেজমেন্টের ঘরটিতে আলোক স্বল্প। বাসি বাতাসের ভ্যাপসা গন্ধটিও যেন দূর হবার নয়। এটিকে ঠিক ঘর মনে হয় না তাঁর; বরং ডেরা বলেই বোধ হয়।  দিনের বেলায় ডেরাটিতে  তাঁর দম বন্ধ লাগে। তার উপর, আজকে আবার তাঁর ভারতীয় রুমমেট মুকেশ শব্দ করে গান শুনছে; হার্ড মেটাল টাইপের গান। গান ছাড়ার আগে, অবশ্য অনুমতি নিয়েছিল।  ফাহিম না করার মতো যথেষ্ট সবল হতে পারে নি। ফাহিম নিভৃতে মৃদু রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে ভালোবাসে। রবিবাবুর গান শোনা মানুষেরা কেন জানি সবল হতে পারে না।

পার্কের পুরো মাঠ ভরে আছে,  হলুদ  ড্যান্ডেলিয়নের ফুলে। হলুদ ফুলের মাঠ দেখলেই ফাহিমের বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে। মনে হয়, সে আদিগন্ত সর্ষে ক্ষেতের মাঝে দাঁড়িয়ে , চোখ বুজে বুক ভরে নি:শ্বাস নিচ্ছে। হলুদ সর্ষে ক্ষেত না থাকলেও, টরোন্টো শহরে গ্রীষ্মকাল দারুণ সুন্দর। খুব বেশী গরম নেই। মৃদুমন্দ বাতাসে ম্যাপল জাতীয় গাছের সবুজ পাতারা কাঁপে। গাছে আর মাঠে অগুণিত স্কুইরেল। মাঠ ভর্তি কবুতর, ঘাসের উপর হেঁটে বেড়ায়। আবার কখনো মনের আনন্দে দল বেঁধে উড়াল দেয়। মাঠে মাদুর পেতে বনভোজন করে একটি দু'টি পরিবার।  কেউবা একলা; স্বল্পবসনে, মাদুরে শুয়ে,  শরীরে রোদ লাগায় আর বই পড়ে। টরোন্টো শহরের ব্যস্ততা কিংবা নাগরিক জীবনের সংগ্রাম , পার্কের বেঞ্চীতে বসে ঠিক বোঝা যায় না।

সাজানো-গুছানো  শহর। অথচ অন্তরালে জীবনের একই টানাপোড়েন। অভিন্ন যন্ত্রণার চোরা স্রোত। বিষয়টি প্রথম টের প্রায়, যখন সে চাকুরী খুঁজতে শুরু করে। শুরুতে জব সাইটে ঢুকে অসংখ্য চাকুরীর জন্য আবেদন করে। কিন্তু ভুল করেও কেউ তাঁকে ডাকে না। লিংকডইনে একটা চাকুরীর বিজ্ঞাপনে একদিনের মাাঝে দুই শত অ্যাপ্লিকেশান। নিউ কামারদের নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের সাথে যোগাযোগ করে সে । ওরা রিজ্যুমি লেখা শেখায়। সফ্ট স্কিল শেখায়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। ডলারে কনভার্ট করা টাকা দ্রুত ফুরিয়ে আসতে থাকে। সে বুঝতে পারে, বাংলাদেশের পড়াশুনা আর অভিজ্ঞতা, দু'টোই সমানভাবে মূল্যহীন।

তাঁকে আবার শূণ্য থেকে শুরু করতে হবে। এক বন্ধুর পরামর্শে, সিকিউরিটির ট্রেনিং দিয়ে, মিনিমাম পেমেন্টে একটা চাকুরী শুরু করে। সিকিউরিটির কাজটি সহজ , কিন্তু সমস্যা হলো, খরচ মেটবার জন্য পে-চেক ছাড়া, কাজের সাথে তাঁর মনের কোন সংযোগ নেই। অচিরেই বিচ্ছিন্নতা অনুভব করতে থাকে। অবশেষে আরেক বন্ধুর পরামর্শে সরকারের স্টুডেন্ট লোন নিয়ে একটা কমিউনিটি কলেজে সফ্টওয়ার ডেভেলাপমেন্টের একটা ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হয়ে যায়। সেখানেই হুয়ার সাথে পরিচয় ফাহিমের।

ফাহিম দেখে, কালো একটা কাঠবেড়ালী খুব কাছে চলে এসেছে। সামনের দুই পা তুলে , তাকিয়ে আছে ফাহিমের দিকে। কি যেন চাইছে! ফাহিম ভাবে, কি দু:সাহস! বাংলাদেশের পেয়ারা-চোর কাঠবেড়ালীরা ভীষণ ভীতু। মানুষ দেখলেই লেজ গুটিয়ে দৌড়ে পালায়। না পালিয়ে উপায়ই বা কি? মানুষের হাতের নাগালের বাইরে থাকাই তো তাঁদের টিকে থাকার প্রধানতম কৌশল। এখানকার কাঠবেড়ালীরা মানুষ দেখলে খুব একটা ভয় পায় না। অনেকেই খাবার এনে গাছের তলায় ছড়িয়ে দেয়। এই কালো কাঠবেড়ালীটি কি তাঁর পাশে থাকা পানির বোতল থেকে পানি চাইছে? যদি তা চায়ও , তবে অবাক হবার কিছু নেই।

হঠাৎ তাঁর মোবাইল ফোনটি বেজে উঠে। ঢাকা থেকে আম্মার ফোন। আম্মার এসময়টাতে ঘুমিয়ে থাকার কথা। কি জানি কোন কারণে বোধ হয় আম্মার ঘুম ভেঙ্গে গেছে, বা ঘুম আসছে না। ফোন কেটে দিয়ে , কল ব্যাক করে। কাঠবেড়ালীটি অবজ্ঞা বুঝতে পেরে  দূরে সরে যায়। 'কি? কেমন আছো, আম্মা?' বলতে গিয়েও প্রশ্নটি করে না ফাহিম। সে জানে, আম্মা উত্তরে কি বলবে? আম্মা বলবে , ভালো নেই, এজন্মে আর ভালো থাকবো না।

বছর দেড়েক আগে, বড় ভাইয়ার মৃত্যুর পর সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। ফাহিম তখন সবে মাত্র টরোন্টোতে এসেছে।

বড় ভাইয়া বিমানের টিকেট কিনে, সব কিছু গুছিয়ে, নিজে গাড়ী চালিয়ে তাঁকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়েছিল। এখনো মাঝে মাঝে ফাহিমের  চোখে ভাসে, বড় ভাইয়া হাত নেড়ে তাঁকে বিদায় জানাচ্ছে। ফাহিমের মনে হয়, ইস্! সময় যদি ওখানেই থমকে যেতো! অথবা ঘুম ভেঙ্গে যদি দেখতো, সে আসলে দু:স্বপ্ন দেখেছিলো এতোক্ষণ । তাঁর ভাইয়া আসলে বেঁচে আছে। শৈশবে তো এমন স্বপ্ন সে বহুবার দেখেছে। তারপর ঘুম ভাঙ্গতেই সবকিছু্ ঠিক-ঠাক। কিন্তু মানুষকে কখনো কখনো দু:স্বপ্নের মাঝেই বাঁচতে হয়।

 

বড় ভাইয়া গাড়ী একপাশে পার্ক করে, রাস্তা পার হচ্ছিল। তখনই একটা বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে এসে পড়ে ভাইয়ার উপর। মৃত্যুর সংবাদ যখন ফহিমদের  বাসায় পৌঁছে, তখন আম্মা আসরের নামাজ পড়ছিলেন। বড় সন্তানের মৃত্যুতে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন আম্মা। আম্মা বলতো, আল্লাহ নাই! আল্লাহ থাকলে, এতো বড় একটা বাস উল্টাইয়া আইস্যা আমার শফিকের উপর পড়লো, আল্লাহ দেখলো না।

তারপর শোকের তীব্রতা কমে এলে, আম্মা সৃষ্টিকর্তার সাথে সন্ধি করে নেয়। মেনে নেয়, মানুষের সীমবদ্ধতা। আরো পরিপূর্ণভাবে অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তার কাছে সমর্পণ করে নিজেকে। এখন আম্মার জীবনের একটাই উদ্দেশ্য, দুনিয়া শেষে কখন সে শফিকের কাছে ফিরে যাবে। শফিকের সাথে কিভাবে দেখা হবে, কখন দেখা হবে এই ভাবনাতেই সময় কাটে তাঁর। এই যে মৃত্যুর পর আরেকটি জগৎ , এওতো এক আশাবাদ। জীবনানন্দ দাসের কবিতা - 'মরণের পর পারে অন্ধকার, এই সব প্রেম, আলো নির্জনতার মতো'- এমন তো নয়।

প্রতিটি মানুষের মনের গঠন বড় বিচিত্রভাবে ভিন্ন। সন্তান হারানোর শোক, আম্মাকে পুরোপুরি ধর্মের দিকে ঠেলে দিলেও, বড় ভাইয়ের মৃত্যু ফাহিমকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে।  প্রিয়তম কন্যা যখন মৃত্যু শ‌য্যায়, চার্লস ডারউইন তখন তাঁর স্ত্রীকে লেখা এক পত্রে চৌদ্দবার ঈশ্বরের কথা উল্লেখ করেন। ঈশ্বরের অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিলো ডারউইনের ভেতর। কিন্তু কন্যার মৃত্যু পর, নিজের মানসিক দ্বন্দ্বটি ঝেড়ে ফেলে, ঈশ্বর থেকে অবমুক্ত করেন নিজেকে। বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর ফাহিমের ক্ষেত্রে ঠিক অনেকটা সেরকমই কিছু ঘটেছিল। 

বড় ভাইয়ের মৃতদেহ হিমাগারে রাখা হয়। ফাহিম টরোন্টো থেকে ফিরলে, বনানী গোরস্থানে কবর দেয়া হয়। দূর্ঘটনায় বিকৃত হয়ে যাওয়া ভাইয়ের মুখটি দেখে নি ফাহিম। সে চেয়েছিল তাঁর স্মৃতিতে সব সময়  ভাইয়ার হাসি-মুখটিই যেন অটুট থাকে। জানাজার নামাজে দাঁড়িয়ে, তাকবির পাঠের সময় , ইমাম  অস্ফুট কণ্ঠে, আল্লাহু আকবর উচ্চারণ করে। ফাহিম আল্লাহু আকবর শব্দযুগলের অর্থ জানে। 'আল্লাহ মহান'।  বড় ভাইয়া খাটিয়ায় শুয়ে আছে। তাঁর প্রৌঢ় পিতা-মাতা, যুবতী ভাবী – যাঁর সামনে পুরো জীবন পরে আছে – সবাই  শোকে পাথর। বড় ভাইয়ার  তিন বছর বয়সী কন্যাটি, বাবার একটা ছবি নিয়ে অপেক্ষা করে আছে, বাবা ফিরলে সে বাবার সাথে ঘুমাবে। এই নিদারুণ বাস্তবতার মাঝে, সৃষ্টিকর্তার মহত্ত্বের কি আছে, তা বুঝে উঠতে পারে না।

ভাইয়ার দূর্ঘটনার কিছুদিন পর, বড় খালু এসে বলে, ' ভালো ছাত্রের জন্য যেমন কঠিন প্রশ্নপত্র করা হয়,  আল্লাহু তা'য়ালাও তাঁর প্রিয় মানুষকেই কঠিনতম পরীক্ষা ফেলে, উনার উপর বিশ্বাস রাখো, এই দুনিয়া অল্প ক'দিনের , সবাইকে উনার কাছেই ফিরে যেতে হবে।'

তাঁর কাছে মনে হয়েছিল, সে তো কঠিনতম পরীক্ষার ভার নিতে রাজী নয়। সে তো স্বেচ্ছায় আসেও নি পৃথিবীতে। তবে তাঁর জন্য কেন এমন নির্দয় খেলা।  সৃষ্টিকর্তা ও ধর্ম দু'টোই তাঁর কাছে   এক ধরণের বড় বোঝা মনে হতে থাকে। 

ফাহিম আর কানাডায় ফিরে আসতে চায় নি। আম্মা জোর করে পাঠিয়েছে। ' এই খানে কোথায় থাকবা? লাইসেন্স ছাড়া হেল্পারে বাস চালায়, দেখার কেউ নাই। ওখানেই নিরাপদে থাকবা।' বারো হাজার মাইল দূর থেকে, ফাহিম ভালো আছে , এটুকু  সান্ত্বনা নিয়েই ঘুমাতে যায় আম্মা ।

 

দুই

টরোন্টো শহরে একটা কমিউনিটি কলেজে, হুয়ার সাথে ফাহিমের পরিচয়। প্রথম পরিচয়ে,  হাত বাড়িয়ে  নিজের নাম বলে, মৃদু  এক চিলতে হেসেছিল হুয়া । হাসির ক্ষণস্থায়িত্ব ফাহিমকে একটি ফুলের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। ফুলটির নাম টান হুয়া । এক আশ্চর্য সুন্দর ফুল। মাঝ রাতে ফোটে, সাদা আভা ছড়িয়ে। সকালেই  ঝরে যায়।  অপসৃয়মান এক সৌন্দর্য। হুয়ার হাসিটিও যেন ঠিক তাই। মাঝারী উচ্চতার ফর্সা হুয়া । অনেকটা  মোমের পুতুলের মতো। চীন দেশের মানুষের মতোই নাক-চোখ, মুখের গড়ন।

টরোন্টোতে আসার আগে সাবিহা খন্দকারের সাথে ফাহিমের বিবাহের ছিল ঠিক-ঠাক। তবে, বাঁশী কবিতার হরিপদ কেরাণীর মতো সে পালিয়ে আসে নি। সাবিহার বাবাই বিয়েটি ভেঙ্গে দেয়। কারণটি বিবিধ জটিল। আম্মা যখন সাবিহা  খন্দকারের সাথে ফাহিমের বিবাহ ঠিক করে, তখন তিনি সাবিহার উন্নত নাসিকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। হুয়ার নাকটি সেই বিচারে পাস-মার্ক পাওয়ার যোগ্যও নয়। তবে  হুয়ার পুরো উপস্থিতিই যেন মায়ায় মাখানো।

ফাহিম একজন কৌতুুহলী মানুষ। বেশ ভালো ছাত্র ছিলো সে। মা-বাবা চেয়েছিল , ছেলে ডাক্তার হোক । কিন্তু ফাহিমকে পেয়েছিল দর্শনের ভূতে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যায় । দর্শনে স্নাতক।  টরোন্টোতে আসার আগে ব্লগে  লেখালেখি করতো ।

চীন দেশের কারো সাথে পরিচয় হলে, ফাহিমের তিয়েন-আমেনের ছাত্র বিক্ষোভের কথা জানতে ইচ্ছে করে। জানতে ইচ্ছে করে, তরুণদের সেই গণতন্ত্রের স্বপ্নটি এখন কোথায়?

হুয়ার কাছেও সে তিয়েন-আমেনের কথা জানতে চেয়েছিল। 

হুয়া ফুলের মতোই হেসে বলেছিল, 'তিয়েন-আমেনের কথা তুমি জানলে কি করে?'

— তুমি বোধ হয় জান না, আমার দেশের সংবাদপত্র ও পাঠ্যক্রম চীনা কমিউনিষ্ট পার্টি নিয়ন্ত্রণ করে না।

হুয়ার সমস্ত মুখে কৌতুক ছড়িয়ে পড়েছিল। নাসিকা-প্রবল কণ্ঠে বলেছিল, ' ইউ আর এ ফানি গাই।'  তারপর হাসি থামিয়ে বলেছিল, 'এ প্রজন্ম , তিয়েন-আমেন নিয়ে আর ভাবে না। তারা গাড়ী আর মোবাইল ফোন নিয়েই বেশী ব্যস্ত।'

'লাইফ অফ পাই' উপন্যাসে একটা ভালুকের গল্প পড়েছিল ফাহিম।  একবার এক চিড়িয়াখানায়, একটি ভালুক খাঁচা থেকে পালিয়ে যায়। পুরো এলাকা তন্য তন্য করে খোঁজা হয়। কোথাও পাওয়া যায় না।  অবশেষে দেখা যায়,  ভালুকটি আবার ফিরে এসে, চুপটি করে বসে আছে , সেই পুরোনো খাঁচার শীতল, অন্ধকার কোনে। খাঁচার বাইরের স্বাধীনতা নয়,  খাঁচার বন্দীত্বই যেন ভালুকটির স্বস্তির সীমানা। 

মানুষও প্রাণী। মানুষকে বন্দী করেও যদি একটা কমফোর্ট জোন তৈরী করে দেয়া যায়, তবে একটা সময় মানুষের কাছে স্বাধীনতা কোন মূখ্য ব্যাপার হয়ে উঠে না। ফাহিম তাঁর আম্মাকে ছোটবেলা থেকেই দেখেছে। তিনি অন্ত:পুরে, বস্ত্রের আবরণে নিজেকে ঢেকে রেখেও, অস্বস্তি বোধ করেন না। নারী স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে যদিও এটি এক ধরণের পরাধীনতা, কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের অনেক মেয়ের কাছেই এটি কমফোর্ট জোন। তাঁরা অন্ত:পুর থেকে বেরিয়ে আসতে চায় না। তাঁরা স্বামী/পিতা/ভাইয়ের ছায়ায় নিরাপদ ও নিশ্চিত  বোধ করে।

হুয়ার কথা শুনে তার মনে হয়েছিল, ব্যাক্তিস্বাধীনতা ব্যাপারটি আসলে একটি আপেক্ষিক বিষয়।

সে মজার মানুষ কিনা, এ বিষয়ে ফাহিম নিশ্চিত নয়। তবে হুয়া তার সাথে কথা বলতে পছন্দ করতো।  হুয়াকে ঘিরে ফাহিমের মনেও এক ধরণের আগ্রহ তৈরী হয়। উৎসুক হলেও , সভ্য সমাজের নিয়ম হলো, তা গোপন করা। বানরেরা তাদের কৌতুহল প্রকাশ করতে পারে । কিন্তু মানুষকে তার কৌতুহল মনের মাঝে পিষে ফেলতে হয়। 

বিষয়টি অনেকটা ষ্টকিং-এর মতো হয়ে গেলেও, ফাহিম হুয়ার ফেসবুক প্রোফাইল চেক করে।  একদিন অসাবধানে তা প্রকাশিত হয়।  'হুয়া তোমার কলেজের কালো ভাষ্কর্যটি...' বলতে গিয়েই থেমে যায় সে। হুয়ার কলেজের কালো ভাষ্কর্যটির কথা তো ফাহিমের জানার কথা নয়। ততক্ষণে দেরী হয়ে গেছে। মূহুর্তেই হুয়ার মুখটি হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। হুয়া ফাহিমের কপালে ছোট এক ফ্লিক করে বলে, 'আমি তোমাকে ধরে ফেলেছি, তুমি আমার ফেসবুক প্রোফাইল চেক করেছো।'

ফাহিম লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলে। হুয়া তর্জনী দিয়ে ফাহিমের অবনত মুখ সোজা করে দেয়। 'লজ্জার কিছু নেই। স্বীকার করছি, আমিও তোমার ফেসবুক প্রোফাইল চেক করেছি।' তারপর বলে, 'যেহেতু তুমি আমার প্রোফাইল চেক করেছো,  তাহলে তো, তুমি জানই আমার একটা বয়ফ্রেন্ড আছে। জিয়ান আমার কলেজ সুইট হার্ট।'

হুয়া বয়সে ফাহিমের চেয়ে ছোট। ব্যাচেলর পাশ করেই, হুয়া  কানাডায় চলে এসেছে। ফাহিম বিশ্বাবিদ্যালয় থেকে পাশ করার পর, তিন চার বছর চাকুরী করেছে। তারপর কানাডায় এসেছে। হুয়া ও অন্যান্য সহপাঠীদের কথা-বার্তা শুনে, চাল-চলন দেখে,  ফাহিম হুয়ার সাথে তার জেনারেশান গ্যাপটি টের পায়। মাঝে মাঝে কৌতুহলী হয়েই, সে বিভিন্ন বিষয়ে হুয়ার দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চায়। হুয়াও খুব আগ্রহ নিয়ে তার প্রশ্নের উত্তর দেয়। যেন আগের প্রজন্মের এক মানুষকে , নতুন প্রজন্মের কায়দা কানুন শেখাচ্ছে সে। বিষয়টিতে হুয়া বেশ মজাও পায়। মাঝে মাঝে মজা করে, ফাহিমকে ডাইনোসর বলে ডাকে। ব্যাপারটি বেশ উপভোগ করে ফাহিম। সে ইচ্ছে করেই আরো বেশী প্রশ্ন করে।

একদিন কলেজের ষ্টুডেন্ট বডির অফিসে,  কোন একটা কাজে যেতে হয় হুয়াকে । ফাহিম তাকে সঙ্গ দেয়। ফেরার সময়, ডেস্কের এক কোণে রাখা একটা পাত্র থেকে, এক ছড়া কনডম তুলে নেয় হুয়া,  'তুমিও এক ছড়া নিয়ে রাখতো পারো।'

ফাহিম যেন একটু লজ্জা পায়। হুয়া বলে, 'তুমি উনিশ শতকের ব্রাইডদের মতো লজ্জা পাচ্ছো কেন?'

ফাহিম হুয়াকে রাগিয়ে দেয়ার জন্যই বলে, ' তোমার কি মনে হয় না, এরা সেক্চুয়াল প্রমিস্কুইটিকে প্রোমোট করছে?'

হুয়া ঠিক ঠিক ক্ষেপে যায়। 'ওহে মিষ্টার ডাইনোসর ! তোমার কি ধারণা, কনডম না থাকলে, উঠতি ছেলে-মেয়েরা মঙ্ক হয়ে যাবে? বরং, এরা তো একটা উপকার করছে। নয়তো, মেয়েরা অকালে প্রেগন্যান্ট হবে, সংক্রমণ ছড়াবে। তার চেয়ে এটাই ভালো নয় কি?'

হুয়া যে তার চেয়ে ভীষণ আলাদা, সেটি আরো বেশী করে অনুভব করে ফাহিম।

গত ক'মাস ধরেই, হুয়াকে যেন বিষন্ন মনে হচ্ছে। ক'দিন আগে কলেজ ক্যাফেটেরিয়াতে, ফাহিম হুয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'তোমাকে বিষন্ন লাগছে। কি হয়েছে তোমার?'

হুয়া চুপ করে ছিল। বেশ কিছু ক্ষণ পর, হুয়া ফাহিমের চোখের দিকে তাকায়। তারপর জিজ্ঞেস করে, ' ফাহিম, হ্যাভ ইউ এভার চিটেড অন ইয়োর গার্লফ্রেন্ড?'

ফাহিম উত্তর দেয় নি। হুয়ার প্রশ্নের উদ্দেশ্য কি, তা ঠাহর করতে পারেনি ফাহিম।

 





তিন

ক্লাস শেষে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল তাঁরা ।

বরফ সাদা এক  দিন। ঘোলাটে আর বিষন্ন। গাড়ীগুলো  ভীষণ শ্লথ। সিটির বরফ সরানোর যন্ত্রগুলো চলছে , অবিরাম। বরফ সরিয়ে, ছিটিয়ে দিচ্ছে লবণ। অনেকক্ষণ ধরে বাসের দেখা নেই। আসিফ বলে, 'হয়তো কোথাও রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে।' তাঁর কণ্ঠে উৎকণ্ঠা। শীতে প্রায় কুঁকড়ে গেছে সে। করাচীর উষ্ণতা ছেড়ে এবছরই এসেছে সে টরোন্টোতে।

আসিফের কথার জবাব দিতেই যেন, এক্সপ্রেস বাসটি এসে তাঁদের সামনে দাঁড়ালো। শীতে তাঁদের হাত-পা-মুখ প্রায় আড়ষ্ট । হুড়মুড় করে  বাসে উঠে গেলো তাঁরা। বাসের ভাড়া দিতে গিয়ে, হুয়া তাঁর কয়েনের বটুয়া খুঁজে পায় না। সে ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলে, ' দু:খিত, আমি আমার কয়েনের বটুয়াটি খুঁজে পাচ্ছি না।'

-- নো প্রোবলেম, সাবওয়ে ষ্টেশানে গিয়ে টোকেন কিনে সেখানেই ভাড়া পরিশোধ করো।

দু:খিত বিব্রত হুয়ার মুখে মুহুর্তেই হাসি ফুটে উঠে। মনে হলো , হাসি নয়, যেন মেঘভাঙ্গা এক টুকরো রোদ।

বাস চলতে থাকলো ধীরে। আসিফ সামনে একটা সিট পেয়ে, দুপ করে বসে পড়লো। 'আর দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না। আমার পায়ের আঙ্গুলগুলো জমে গেছে।'

ফাহিম আর হুয়া বাসের পেছনের দিকে এগিয়ে গিয়ে পাশাপাশি বসলো।

রাস্তার দু'ধারে একতলা বাংলো বাড়ীগুলোর ছাদ তুষারে ঢেকে গেছে। বরফে ডুবে গেছে বাড়ীগুলোর ড্রাইভওয়ে , আর আঙ্গিনাও। বাড়ীগুলোর ভেতর যেন কোন প্রাণের স্পন্দন নেই। শীতকালের বিকেলে শহরটাকে ভীষণ ভূতুড়ে লাগে।

খানিকটা দোলে দোলে শ্লথগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাস। তাঁরা দুলছে। হুয়া একটা রঙ্গীন উলের টুপি পরেছে। সে তাকিয়ে আছে সেল ফোনের দিকে। বাসের দুলুনিতে তাঁর ফর্সা , সিগ্ধ , কোমল মুখটাও দুলছে। সুন্দর লাগছে তাঁকে। হঠাৎ মুখ তুলে ফাহিমের দিকে তাকালো সে। ' কি দেখছ?'

ফাহিম বললো, জানালার বাইরের তুষারপাত দেখছি।

হুয়া একটু হাসলো। বললো, 'আমি ভাবলাম, তুমি আমাকেই দেখছো। ইউ নো ষ্টেয়ারিং ইস ক্রিপি।'

ফাহিম একটু লজ্জা পেলো।

তারপর তাঁরা  ফিঞ্চ স্টেশানে পৌঁছে যায়। হুয়া হন্যে হয়ে টোকেন বিক্রির কাউন্টার খুঁজতে থাকে।

আসিফ  বলে, টোকেন বিক্রির কাউন্টারটি যেহেতু  খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, চলো, চলে যাই। ড্রাইভার বলেছে ঠিকই, কিন্তু সে আসলে আশা করে না, তুমি এখানে এসে ভাড়া পরিশোধ করবে।

'তোমরা  চলে যেতে পারো। এই ভাড়া পরিশোধ না করলে, আমি অপরাধবোধে ভুগবো।' হুয়ার কণ্ঠ দৃঢ়।

আসিফ: হ্যাঁ, সৃষ্টিকর্তা সবকিছু দেখে।

হুয়া: সৃস্টিকর্তা কি আমি তা জানি না। এটি আমি নিজের জন্য  করছি।

আসিফ: তুমি কি অ্যাথিষ্ট?

হুয়া: আমাদের সমাজে সৃষ্টিকর্তার কোন কনসেপ্টই নেই। গড মিনস নাথিং টু মি।

হুয়া বেইজিং-এর আশেপাশে কোথাও বড় হয়েছে। সে আগেও   বলেছে, ঈশ্বর তাঁদের সমাজে অনুপস্থিত। ঈশ্বর শব্দটি কোন অর্থ বহন করে না তাঁর কাছে।

হুয়া দুই-একবার পথ হারিয়ে , মিনিট পাঁচেক সময় খরচ করে, অবশেষে টোকেন বিক্রির কাউন্টার খুঁজে বের করে।  ক্রেডিট কার্ড দিয়ে  টোকেন কিনে ভাড়া পরিশোধ করে।

ফিঞ্চ ষ্টেশান থেকেই আসিফের রাস্তা অন্যদিকে। সে বিদায় নেয়।

ফাহিম আর হুয়া এক নম্বর লাইনের সাবওয়েতে উঠে। শেফার্ড ষ্টেশান কাছাকাছি আসতেই, হুয়া একেবারে  কাছে এসে, ফিস ফিস করে বলে, ' ইউ নো ফাহিম, স্টেয়ারিং ইজ ক্রিপি। মনে থাকবে তো?' ফাহিম তাঁর ঘাড়ে হুয়ার নিশ্বাস অনুভব করে। তারপর, ফাহিমকে বিদায় বলে  ট্রেন থেকে নেমে যায় সে। হুয়া বেভিউ রোডে তাঁর বয়ফ্রেন্ডের কন্ডোতে থাকে। তাঁকে অন্য লাইন ধরতে হবে।

আবহাওয়া ভীষণ খারাপ। ট্রেনে মানুষ বেশী নেই। ফাহিম পাশে সরে গিয়ে হুয়ার ছেড়ে যাওয়া আসনটিতে বসে। হুয়ার পেছনে ফেলে যাওয়া শূণ্যতার মাঝে ফাহিম তাঁর পারফিউমের গন্ধ পায়। জোরে শ্বাস নিয়ে বুকের মাঝে গন্ধটা ধরে রাখার চেষ্টা করে সে, করে যায়। ক্রমেই অসংখ্য ভাবনা লাল পিঁপড়ের মতো ছেঁকে ধরে তাঁকে।  ভাইয়ার  দূর্ঘটনার পর,  একা হতে ভয় লাগে তাঁর। একা সময় কাটানো যেনো নিজের সাথে যুদ্ধ। মনে হয়, পুড়ো এক ভগ্ন দালান বাড়ীতে সে একা। চারদিকে শুধু কানাকানি আর ফিসফিস। দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি।

কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে। কার্লোস ফুয়েন্টেস-এর ‘নীটশে অন হিজ ব্যালকনী’। আগেও পড়েছে বইটা। বইটির বক্তব্য ঠিক পূর্ণ হয়ে ধরা দেয়া না তাঁর কাছে।  পড়তে শুরু করে।  ট্রেনের দুলুনিতে তন্দ্রা এসে যায়। তন্দ্রালু চোখে সে দেখে একজন ভদ্রলোক তাঁর মুখোমুখি এসে বসেছেন। পরণে কোট আর টাই। ঠোঁটের উপর মোটা গোঁফ। তাঁর লোকটিকে চেনা চেনা লাগে।

তিনি ফাহিমের দিকে সরাসরি তাকান।

-- ফাহিম, তুমি তো মেয়েটির প্রেমে পড়ে গেছো?

-- আরে না। ওর তো বয়ফ্রেন্ড আছে।

-- দূর্বল লজিক। বয়ফ্রেন্ড থাকার মেয়ের প্রেমে পড়ে যাওয়া কি অসম্ভব?

-- তা ঠিক।

-- তবে মেয়েটির কিন্তু তোমার মতো নয়।

-- মানে।

-- খেয়াল করেছো, মেয়েটি কেমন করে বললো, গড মিনস নাথিং টু মি।

-- হু

-- তুমি কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে , ঈশ্বর তোমার কাছে কোন অর্থই বহন করে না।

-- কিন্তু আমিও যুক্তিবাদী। আমি ঈশ্বরভাবনাকে রেশানালাইজ করি।

-- তুমি যাই করো না কেন, তুমি কখনোই ঈশ্বরের প্রভাব বলয়ের বাইরে নও। তোমার অবিশ্বাস,  সিম্পলি ঈশ্বরের উপর একটা ক্ষোভ। তুমি যদি কারো উপর ক্ষুব্ধ হও, তবে তো সে অনস্তিত্ব নয়।

-- কে ? কে আপনি?

-- চিনতে পারলে না। তোমার হাতে ধরা বইটিতে আমার ছবিটা দেখো।

-- ওহ! আপনি নীটশে!

-- হু! আমাকে ঠিক কেউই চিনতে পারে না।

-- আচ্ছা, আপনি কি হুয়ার মতো বলতে পারেন, গড মিনস নার্থিং টু মি? আপনি কি পুরোপুরি নাস্তিক?

-- আমি শুধু বলেছি, গড ইজ ডেড।

-- তার মানে কি, একদা ঈশ্বর ছিলেন, এখন তিনি মৃত?

-- যা খুশী ভাবতে পারো। সত্য এক আপেক্ষিক বিষয়।

-- আপনি ছোট বেলায় আপনার পাদ্রী পিতাকে তিলে তিলে মারা যেতে দেখেছেন। আপনিও কি আমার মতোই ঈশ্বরের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন?

কোন উত্তর না দিয়ে, সামনে বসা ভদ্রলোক মিটি মিটি হাসেন।

ট্রেন ইয়াং ষ্টেশানে এসে পৌঁছে গেছে। ফাহিম উঠে দাঁড়ায় । তাঁকে ট্রেন বদল করতে হবে এখন।

 

চার

 

ফাহিম মনে করতে পারে না, প্রথম কিভাবে ঈশ্বর ভাবনাটি তাঁর ভেতর প্রবেশ করেছিল। তাঁর আর ঈশ্বরের অস্তিত্ব যেন একই বিন্দু থেকে শুরু। প্রাচীন স্মৃতি আতিপাতি করে খুঁজে সে।  একটি ঘটনা মনে করতে পারে।

 

খুব ছোটবেলোয়, বার্ষিক পরীক্ষার শেষে, তারা একবার নানার বাড়ী বেড়াতে গিয়েছিল । শীতের সকাল। গাছ থেকে খেঁজুরের রসের হাড়ি নামানো হয়েছে। খেঁজুরের রস ঘিরে তৈরী হয়েছে ছোট জটলা। কুয়াশা ভেদ করে রোদ উঠছে ঝলমল করে। নানাবাড়ীর রবিশস্যের বাগানে বাঁধাকপিতে জমে থাকা শিশির ঝিলমিল করে উঠছে। বেগুন ক্ষেতের কাকতাড়ুয়াটি যেন আড়মোড় ভেঙ্গে এখনই উঠে দাঁড়িয়েছে। ছোটখালা তখন কলেজে পড়ে। কালো জাম তৈরী করে ভাগ্নেদের খাওয়াবে বলে তিনি উৎফুল্ল। ফাহিম ইতিপূর্বে কালো জাম খেয়েছে। কিন্তু মিষ্টিটি তৈরী হতে  দেখে নি। সে আগ্রহ নিয়ে রান্না ঘরে এসে দাঁড়ায়।  ভাজা 'কালো জাম' শিরায় ফেলছে ছোট খালা।  শিরায় দেয়া মাত্রই, সব মিষ্টিই ভেঙ্গে  গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে। ছোট খালা কাঁদো কাঁদো। নানী এসে কালো জামের কাইয়ে কি যেন একটু  মিশালেন। নতুন করে তৈরী কালো জাম আবার ভাজা হলো।  নানী এবার ছোট খালাকে 'কুলফু আল্লাহু' সুরা পড়ে, শিরার পাত্রে ফুঁ দেবার পরামর্শ দেন। ছোট খালা বিড় বিড় করে সুরা পড়ে, শিরার পাত্রে ফুঁ দিলেন। তারপর, কালো জাম আবার শিরায় ফেলা হলো। এবার আর মিষ্টি ভাঙ্গলো না। কি আশ্চর্য ম্যাজিক!

 

কারো অসুখ হলে সুরা ফাতিহা পাঠ করে ফু দিতেন নানা ভাই। ফাহিমের আব্বার অফিসের পিয়ন কাশেম আলীর হাতে ছিল একটা একজিমার দাগ। তাঁকে ডাক্তার দেখাতে বললে, সে বলতো, 'দাওয়ায় আর কি হয়? আসল জিনিস হলো দোয়া। বড় হুজুরের পানি পড়া আনছি। হুজুর বলছে, আল্লাহ চাইলে ভালো হয়ে যাবে।' 

 

আব্বা-আম্মা, নানা-নানী, খালা-খালু, চাচা-চাচী, কাজের মানুষজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব, সকলের আলাপচারীতায় ছিল অদৃশ্য এক সৃষ্টিকর্তার  অভ্রান্ত উপস্থিতি । গোলাকার পৃথিবীর চতুর্দিকে যেমন বায়ুমণ্ডল, তেমনি ফাহিম যে দুনিয়ায় বড় হয়ে উঠেছে, সে দুনিয়াকে ঘিরে রেখেছে মানুষের ঈশ্বরভাবনা। যা বায়ুমণ্ডলের মতোই অদৃশ্য। এ যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার জগত। কল্পিত কিন্তু বায়ুমণ্ডলের মতো সর্বব্যাপী।  

 

শিশুরা যেমন রূপকথায় বিশ্বাস করে, ঠিক তেমনি করে ধর্মের কথা-উপকথাগুলোকে বিশ্বাস করতে শুরু করে সে। ছেলেবেলায় যখন বাসার কাজের ছেলেটি তাঁকে আদম-হাওয়া আর গন্ধমের গল্প বলে, তখন বিনা প্রশ্নেই তা বিশ্বাস করে ফাহিম। বিকাল বেলায় আরবী পড়াতে আসা  হুজুর যখন মুসা নবীর হাতের লাঠির সাপ  হয়ে যাওয়া, কিংবা ইউসুফ নবীর মাছের পেটে চল্লিশ দিন কাটিয়ে দেবার গল্প করতো, তখন ফাহিম তা বিশ্বাস করতো বিনা প্রশ্নে। ঠিক যেমন করে সে পিনোকিওর তিমি মাছের পেটে বসবাসের গল্পে বিশ্বাস করতো।

 

একবার ফ্রীজ থেকে  চকোলেট চুরি করে ধরা পড়ে যায় ফাহিম। আম্মা বলে,  মিথ্যা বললে গুণাহ হয় ফাহিম। কাঁধের দুই ফেরেস্তা সব সময় সে হিসাব রাখে। আল্লাহর কাছে মাফ চাও ফাহিম। ফাহিম বিষন্ন , নিরুপায় হয়ে আল্লাহর কাছে মাপ চায়। তাঁর মনের মাঝে এক ধরণের অনুশোচনা বোধ হয়।

 

চকোলেট খুব প্রিয় ছিল তাঁর। কিন্তু দাঁত নষ্ট হবে বলে, বেশী খেতে দিতো না আম্মা। তাঁর ইচ্ছে হতো, ফ্রীজ খুলে চকোলেট চুরি করে খায়। কিন্তু যতবার চুরি করার ভাবনা তাঁর মনে তৈরী হতো, ততবার তাঁর মনে হতো, তাঁর দুই কাঁধের দুই ফেরেস্তা তাঁকে দেখছে, তাঁর ভালো আর খারাপ কাজের হিসেব রাখছে। দুই কাঁধের দুই ফেরেস্তা, তাঁর কাছে তখন গল্প ছিল না। ভীষণ বাস্তব ছিল তাঁর কাছে।

 

শিশুদের জগতটি ভীষণ সরল। পৃথিবীময় শুধু মুগ্ধতা।  অবিশ্বাস বিষয়টি এক দূরতম ভাবনা। কিন্তু ট্রাজেডী হলো, মানুষ চিরকাল শিশু থাকে না। একদিন তাঁর মনে প্রশ্নের উদয় হতে থাকে। 

 

কৈশোরে বন্ধুদের কাছ থেকে শুনে এসে, যখন সে স্বমৈথুনে নিজের শরীরকে আবিষ্কার করে, তখন, শুরুতে তাঁর মনে হতো, কাঁধের ফেরেস্তা তাঁকে দেখছে। কিন্তু ততদিনে ডালিম কুমারের রূপকথার গল্পের মতো, ধর্মীয় কথা-উপকথাগুলোর সাথেও তাঁর এক ধরণের দূরত্ব তৈরী হয়ে গেছে। শুরুতে কিছু দিন সে অনুশোচনায় ভুগে, কিন্তু তারপর থেকে সে যেন এক সুতো ছেঁড়া হিলিয়াম বেলুন।

 

ফাহিমের বাবা পেশায় প্রকৌশলী । যদিও বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন তিনি, কিন্তু বিজ্ঞানের সাথে তাঁর সম্পর্কটি ছিলো পেশাগত কারণে। তাঁদের বাড়ীর ড্রয়ইং রুমের বুক সেলফে কিছু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বই, আর বাকী সেলফ ভর্তি  ছিল ধর্ম বিষয়ক বইয়ে। কাজের বাইরে, সময় পেলে তিনি ধর্মের বই পড়তেন। 

 

ফাহিম বই পড়তে ভালোবাসতো। ফাহিমের পড়ার জগতটির সাথে, তাঁদের ড্রয়ইং রুমের বইয়ের জগতের কোন মিল ছিল না। তাই তাঁর বইয়ের ভান্ডারটি গড়ে উঠে, তাঁর নিজের ঘরে। একদিন আব্বা তাঁর ঘরে এসে, পড়ার টেবিলে, হকিন্সের 'ব্রীফ হিস্ট্রি অফ টাইম' বইটি দেখে, পড়ার জন্য নিয়ে যায়।

 

বইটি পড়া শেষ হলে ফাহিমকে বলে, 'যত বড় মহাবিশ্ব, তত বড় শূণ্যতা। মহাবিশ্বকে ছোট রাখাই ভালো।' আব্বা কি বুঝাতে চায়, ফাহিম তা বুঝে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে। মহাবিশ্বের শূণ্যতা এসে প্রবেশ করেছে তাঁর মাঝে।

 

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে , চাকুরীতে ঢুকে সে। কিছু দিন পর, পরিবার থেকে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়। সাবিহা নামের একটি মেয়ে। মেয়েটিকে সে আগে থেকেই চিনতো। আম্মার সেকেন্ড কাজিন সবুর আংকেলের মেয়ে। সবুর আংকেল আগে দুবাই থাকতেন। এখন কনস্ট্রাকশানের ব্যবসা। এক ওয়াক্ত নামাজও বাদ পড়ে না তাঁর।। মসজিদে প্রচুর দান খয়রাত করেন। বছরে একবার পরিবারসহ ওমরাহ করতে যান। ফর্সা, ছিপছিপে, স্মিতহাসি, মিতবাক, পর্দানশীল মেয়ে সাবিহাকে আম্মার খুব পছন্দ।

 

বিয়ে ঠিক হবার পর, প্রতি রাতেই সাবিহার সাথে কথা হতো ফাহিমের।  মুখচোরা স্বভাবের জন্য, সহপাঠী মেয়েদের সাথে তাঁর প্রায় কথাই হতো না। সাবিহার সাথে কথা বলে, ফাহিমের মনে হতো, এও আরেক রূপকথার জগত। সাবিহা মাঝে মাঝে বলতো, আব্বা বলেছে, বিয়ের পর ফাহিমকেও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হবে। এধরণের প্রসঙ্গ এলে, আড়ষ্ট বোধ করতো ঠিকই, কিন্তু সাবিহাকে তাঁর ভালোই লাগতো। 

 

বিয়ের মাসখানেক আগে সাবিহার বাবা বিয়েটি ভেঙ্গে দেন। কার কাছ থেকে যেন তিনি শুনেছেন, ফাহিম নাস্তিক টাইপের ছেলে। নামাজ-কালাম কোন দিনই পড়বে না। ছেলেকে সঠিক শিক্ষা দিতে না পারার জন্য, ফাহিমের আব্বা-আম্মাকে খানিক ভর্ৎসনাও করেন তিনি। এর কিছুদিন পর শোনা যায়, সাবিহার বিয়ে হয়ে গেছে । ছেলে অষ্ট্রেলিয়ায় ডাক্তার, পরহেজগার । মুখে ইয়া লম্বা দাড়ি। 

 

বিয়ে ভেঙ্গে যাবার পর ফাহিম এক ধরণের নি:সঙ্গতায় ভুগতে থাকে। রাত হলেই, সে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতো। জানালা দিয়ে, যেটুকু আকাশ দেখা যায়, সে দিকে তাকিয়ে ফাহিম ভাবতো, সাবিহা কি  এমন করেই তাঁর জন্য শূণ্যতা অনুভব করছে। পালিয়ে যাবার কথা মনে হতো বার বার। 

 

বাংলাদেশে তখন মুক্তচিন্তার লেখকদের কুপিয়ে মারা হচ্ছে। এই লেখকদের দু'একজনের সাথে, অর্ন্তজালে যোগাযোগও ছিল ফাহিমের । বড় ভাইয়া তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনিই ফাহিমের কানাডা আসার সব ব্যবস্থা করে দেন।

 

পাঁচ

 

হুয়ার মেসেজ আসে। 

 'আমি খুবই দু:খিত। দশ মিনিট দেরী হবে। গাড়ীতে গ্যাস ছিল না, গ্যাস নিতে একটু দেরী হচ্ছে। তোমাকে অপেক্ষা করিয়ে রাখতে আমি ব্যথিত বোধ করছি।'

দশ মিনিট দেরী খুব গুরুতর কিছু নয়। সে ইচ্ছে করলে, কোন মেসেজ না দিলেও পারতো। অথবা দিলেও, খুব ছোট করে জানিয়ে দিতে পারতো, তাঁর দশ মিনিট দেরী হবে।  কিন্তু  দায়সারা গোছের আনুষ্ঠানিক দু:খ প্রকাশ হুয়ার স্বভাব নয়। সে যা বলে, তা মন থেকেই। ফাহিম কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে, হুয়া মেসেজ টাইপ করছে, তাঁর মুখে রাজ্যের বিষাদ। ফাহিম কাউকে হুয়ার মতো আন্তরিকভাবে  দু:খ প্রকাশ করতে দেখে নি।

হুয়া ভীষণরকম এক সংবেদনশীল মানুষ। রাস্তায় পাখীর মৃতদেহ পড়ে থাকলেও সে ব্যথিত হয় । ঢং করে নয়, সত্যিকার অর্থেই। কেউ এসে ভিক্ষা চাইলেও, সে কয়েনের বটুয়া খুঁজে বের করে, তাঁকে সাহায্য করে। এমন কি যুবক বয়সের ড্রাগ-এডিক্ট ভিক্ষুকদের  ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে না। সে বলে, তুমি মানুষকে বাইরে থেকে দেখে ঠিক বিচার করতে পারবে না, মানুষটির ভেতরে কি চলছে। ইউ নেভার নো, হি মাইট হ্যাভ সাইকোলজিক্যাল ইস্যু। 

হুয়া যখন সিরিয়াস ও বিষন্ন হয়ে ‘আই অ্যাম সরি’ বলে, অথবা ভীষণরকম সমবেদনা নিয়ে কাউকে সাহায্য করে,  তখন ফাহিমের মনে হয়, বিষন্নতারও এক ধরনের সৌন্দর্য আছে। ফাহিমের ভালো লাগে। কিন্তু  ভালো লাগাটিকে  খুব বেশী প্রশ্রয় দেয় না ফাহিম। হুয়ার একজন স্টেডি বয়ফ্রেন্ড আছে। তাঁরা এক সাথেই থাকে। ফাহিম শুরু থেকেই তা জানে। তারপরও হুয়ার প্রতি তাঁর এক ধরণের ভালো লাগা আছে। ভালো লাগাটির মাঝে এক ধরণের যৌনতা-সঞ্জাত  আবেদন আছে, তা সত্য, কিন্তু হুয়ার মাঝে একধরণের অ্যানিগম্যাটিক রহস্যময়তাও আছে। পাঁচ হাজার বছরের চীনা সভ্যতার মাঝে যেমন অজানা বিস্ময় আছে হুয়া যেন অনেকটা সেরকমই।

 

হুয়া আসে। 

 

সাদা মার্সিডিজের দরজা খুলে, পা রাখে রাস্তায়। পরণে তাঁর ফুল আঁকা সবুজ রঙের ফ্রক। সে এসেই আরো এক দমকা দু:খ প্রকাশ করে। তাঁরা লাইব্রেরীর দিকে রওনা দেয়। পৌঁছে দেখে, লাইব্রেরী বন্ধ। ভেতরে কোথাও ফ্লাডিং হয়েছে। অনাকাঙ্খিত অসুবিধার জন্য দু:খ প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।

 

হুয়া বলে, তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েই, ক্লাস প্রোজেক্টের কাজটি শেষ করা যেতে পারে। ফ্ল্যাট ফাঁকা ও নিরিবিলি। তাঁর বয়ফ্রেন্ড এখন চীনে। প্রোজেক্ট সাবমিট করার তাড়া আছে। ফাহিম আপত্তির কোন কারণ দেখে না।

 

বেভিউ রোডে উঁচু এক অট্টালিকার চৌদ্দতলায় হুয়াদের বাস। এক বেড রুমের এপার্টমেন্ট।   খুব পরিপাটি করে গোছানো। দীঘল লিভিং রুমের এক পাশে কিচেন। কিচেনের সামনে ছোট গোল একটা ডাইনিং টেবিল। হালকা  ফিরোজা রঙের দেয়ালের সাথে ম্যাচিং করা সকল আসবাব পত্র। সোফার ঠিক পেছনেই , একটা ওয়াল পেপারে লতিয়ে উঠা বৃক্ষ আর ময়ুরের ছবি।   কোন ধরণের ট্রাডিশনাল চাইনীজ আর্ট।

 

ফাহিম  হুয়াকে উদ্দেশ্য বলে , হুয়া , ইউ হ্যাভ এ নাইস হোম।

 

 হুয়া খুব ছোট করে বলে, হোম ?

 

 এক ধরণের গভীর বিষাদ ছড়িয়ে পড়ে তাঁর কণ্ঠে।

 

আজই ক্লাস প্রোজেক্ট সাবমিট করার শেষ দিন। ডেটলাইন সবসময়ই এক ধরণের অস্বস্তি সৃষ্টি করে । ফাহিমের মনে হয়, ক্লাসের প্রোজেক্টটি যেন মনের ভেতর একটা কাঁটার মতো বিঁধে আছে। তাঁরা দ্রুত কাজের মাঝে ডুবে যায়।  ডাইনিং টেবিলে পাশাপাশি বসে, ক্লাসের প্রোজেক্ট নিয়ে আলোচনা চলে। ঘন্টা দুয়েকের মাঝে কাজ শেষ হয়ে গেলে, প্রোজেক্ট ম্যাটারিয়াল প্রফেসরকে ইমেইল করে, সোফায় গিয়ে বসে তাঁরা। 

 

সোফায় গা এলিয়ে বসে, ফাহিম প্রথমবারের মতো খেয়াল করে, হুয়ার পরণে হাফ প্যান্ট আর টি শার্ট। ল্যাপটপে কাজ করতে করতে এক ফাঁকে, হুয়া তার বাইরের পোষাক পরিবর্তন করে, ঘরের আটপৌরে পোষাক পরে এসেছে। এতোক্ষণ খেয়াল করে নি ফাহিম। হুয়ার পরণের পোষাকটি হয়তো খুবই স্বাভাবিক। সে হয়তো তাঁর বন্ধুদের সাথে ‘হ্যাং আউট’ করার সময় এধরণের পোষাকই পরে। কিন্তু বিষয়টি ফাহিমের জন্য সেরকম নয়। 

 

বাংলাদেশে ছেলেরা এমনভাবে বেড়ে উঠে যে, নারীর ইষদ উন্মোচিত শরীরও তাঁদের ভেতর এক ধরণের অস্বস্তির জন্ম দেয়।  ফাহিম এর আগে কখনো এমন স্বল্প পোষাকের কোন মেয়ের সাথে নিভৃতে বসে গল্প করে নি। শর্টস,  টি-শার্ট পরা মেয়ে-বন্ধু সে  শুধু দেখেছে, ইংরেজী ছবি আর টিভিতে । এক ধরণের অস্বস্তি গ্রাস করে তাঁকে। হুয়ার সাথে কথা বলে,  দেয়ালের ময়ুর আঁকা ওয়াল পেপারের দিকে তাকিয়ে। তাঁর মনে হয়,  নারীকে পর্দার আড়ালে ঢেকে রাখার প্রধান কারণ হলো পুরুষের অবদমিত যৌনতা। অনাবৃত নারীদেহ পুরুষের কাছে এক ধরণের হুমকি। অনাবৃত নারীদেহ তাঁদের ভালনারেবল করে তুলে। 

 

– তোমার সাথে পরিচয় হওয়ার আগে, কোন বাংলাদেশীর সাথে মেশার সুযোগ হয় নি। দূর থেকে যে ক'জনকে দেখেছি, সবার গায়ের রং কালো। তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল, তুমি ভারতীয়। 

 

ফাহিম বলে, 'বাংলাদেশের মানুষের চেহারার কোন নির্দিষ্ট কোন বৈশিষ্ট নেই। বেটে, লম্বা, কালো, সাদা, খাঁড়া নাক, বোঁচা নাক সব ধরণের বাংলাদেশীই আছে। আমরা কিন্তু চাইনীজ দেখলেই  বলে দিতে পারি সে চাইনীজ।'

 

- কিভাবে?

 

চীনাদের ছোট ছোট চোখ, অনুন্নত নাক দেখলেই বুঝা যায়, এরা পূর্ব এশিয়া থেকে এসেছে। বাংলাদেশে এদের সবাই নাক বোঁচা চাইনীজ। সবার চেহারাই  একই রকম। শি পেং আর ঝিন ঝিয়াং আলাদা কোন ব্যাক্তি নয় । ফাহিম ভাবে, বিষয়টি যদি  ব্যাখ্যা করে বলে, কে জানে, হুয়া হয়তো তাঁকে রেসিষ্ট ভেবে বসতে পারে। ফাহিম বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলে, ‘ঠিক ব্যাখ্যা করে বলতে পারবো না। তবে চীনা দেখলেই আমরা বুঝতে পারি।’ 

 

- রিয়েলি। 

 

হুয়া হাসে। 

 

কিছুক্ষণ পর, হুয়া ফাহিমকে বিয়ার অফার করে। 'তুমি তো মুসলিম। শুনেছি, অনেক মুসলিম অ্যালকোহল পান করে না। আমাকে সঙ্গ দিতে একটা বিয়ার পান করতে চাও?'

 

বিয়ার ফাহিমের পছন্দের পানীয় নয়। বন্ধু-বান্ধবের আড্ডায় ফাহিম বিয়ার পান করেছে। বিয়ারের তিক্ত স্বাদ তাঁর পছন্দ না। কিন্তু হুয়া  ধর্মের কথা তুলে এনেছে। হুয়া তাঁকে গোঁড়া মুসলিম ভেবে বসতে পারে। ফাহিম তাঁকে ভুল ধারণা দিতে চায় না। সে একটা বিয়ার পান করার সিদ্ধান্ত নেয়। বলে, আমার জন্ম মুসলিম পরিবারে, আমি ঠিক ততটা কট্টর মুসলিম নই।

 

হুয়া দু'টি চিলড বিয়ারের ক্যান এনে একটি ফাহিমকে দেয়। আরেকটি নিজের জন্য সশব্দে খুলে। বিয়ারের ফেনা কিছুটা উপচে, তার টিশার্টের উপর পড়ে, বুকের উপর ভিজিয়ে দেয়। তরুণীর বুকে জল ছলকে পড়েছে, সেটি ফাহিম ঠিকই লক্ষ্য করে। না তাকিয়ে চোখেরই বা কি উপায় ?

 

বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে, তাঁরা গল্প করে। ফাহিম  বিয়ারে অনভ্যস্ত, তাই  ভীষণ সাবধানে অল্প অল্প করে পান করে। হুয়া তাঁর হাতের বিয়ারের ক্যান শেষ করে, আরেকটি বিয়ার খুলে। দ্বিতীয় বিয়ার খোলার পর থেকে, হুয়ার কথার মাঝে একটা স্বত:স্ফূর্ততা চলে আসে। স্বাভাবিক সময়ে হয়তো, ইংরেজী বলার সময়, শব্দচয়ন আর গ্রামার সম্পর্কে সচেতন থাকতো। সে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে কথা বলতো। বিয়ারের আলকোহল রক্তে মেশার পর , তাঁর  জড়তাটুকু কেটে যায়। তাঁর প্রকাশের ইচ্ছাটি যেন বাড়তে থাকে।

 

সে প্রথম বারের মতো, তাঁর বয়ফ্রেন্ড জিয়ানের  গল্প করে।  এর আগে, হুয়া কখনো তাঁর ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে আলাপ করে নি। 

 

হুয়ার গল্পটি অতি সাধারণ। জিয়ান তাঁর প্রথম প্রেম। কলেজের প্রথম বর্ষ থেকে তাঁদের সম্পর্ক। সামনের মাসে তাঁদের সম্পর্কের পাঁচ বছর পূর্ণ হবে। জিয়ান ও হুয়ার পরিবারও পারিবারিকভাবে ঘনিষ্ঠ। জিয়ান ও হুয়ার সম্পর্কটি দৃঢ় হলে, তাঁদের পরিবারের সবাই খুশী হয়। কলেজে পড়া শেষ হলে, দু'জনই কানাডায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।

 

হুয়া বলে, চীনের মানুষের জীবনে শুধু কাজ আর কাজ। বাতাসে ধূয়া আর ঘাম। তাঁদের মনে হতো , তাঁরা এমন এক স্থানে যাবে যেখানে বুক ভরে নি:শ্বাস নিতে পারবে। জীবনকে উপভোগ করতে পারবে।  জিয়ানের বাবা একজন শিল্পপতি। তাঁরা এখানে আসার পর,  থাকার জন্য এই কন্ডোটা তিনিই কিনে দিয়েছেন। হুয়া কন্ঠে কিছুটা প্রহসনের আমেজ এনে বলে, চীনের বাতাস দূষিত করে আমরা কানাডার বিশুদ্ধ বাতাস কিনি।

 

কানাডায় আসার আগে  জিয়ানের সাথে নিয়মিত অভিসারে যেত হুয়া, কিন্তু কখনোই এক সাথে বাস করে নি। টরোন্টোতে আসার পরই তাঁরা একত্রে থাকতে শুরু করে। অল্প কিছু দিনের মাঝেই, হুয়া বুঝতে পারে, জিয়ান ঠিক সেই মানুষটি নয় , যাঁর সাথে পুরো জীবন কাটানো উচিত। একটা সময় ছিলো যখন মনে হতো, সমগ্র পৃথিবীতে জিয়ান থাকলেই, কখনো সে নি:সঙ্গ বোধ করবে না। হুয়ার মনে হতো, জিয়ানের হাত ধরেই একটা জীবন দিব্যি কাটিয়ে দেয়া যায়। 'আজ  আর সে রকম ভাবে অনুভব করি না। কেন?’ কাকে প্রশ্নটি করে বুঝা যায় না। হুয়া  বিষন্নতর  হয়ে যায়।

 

ফাহিমের ভীষণ জানতে ইচ্ছে হয়,  হুয়া ও জিয়ানের মাঝে ঠিক কি এমন ঘটেছে। কিন্তু ব্যক্তিগত সীমানা পেরিয়ে যাবে বলেই, চুপ করে থাকে।

 

বিয়ারের ক্যানে ঠোঁট লাগিয়ে হুয়া বুঝতে পারে, ওখানে আর তরল অবশিষ্ট নেই। বিয়ারের ক্যান 

উপুড় করে ধরে  হুয়া;  যেন  নিশ্চিত হতে চায় ক্যানে আর বিয়ার অবশিষ্ট নেই। সে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, 'শেষ! ..... সবই একসময় শেষ হয়ে যায়।'

 

হুয়া সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। হঠাৎ চোখ মেলে  উঠে বসে। ফাহিমের মনে হয়, হুয়ার হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ে গেছে। কিন্তু ফাহিমকে অবাক করে দিয়ে, আবার সেই প্রশ্নটি করে,  ' হ্যাভ ইউ এভার চিটেড অন ইয়োর গার্লফ্রেন্ড?’'

 

হুয়ার এমন প্রশ্নে ফাহিম খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। সে  প্রশ্নের উদ্দেশ্য বুঝে উঠতে পারে না । এরা যাকে বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড বলে, বাংলাদেশে আসলে সে সম্পর্কটি একেবারে অনুপস্থিত।  সাবিহার সাথে অনেকদিন ফোনে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলেছে ফাহিম। কিন্তু সাবিহা ফাহিমের  চেয়েও রক্ষণশীল পরিবেশে বড় হয়েছে, তাই সম্পর্কটি চুম্বন পর্যন্তও পৌঁছে নি। সাবিহার সাথে বিবাহ-পূর্ববর্তী সম্পর্কটিকে যদি বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ডের সম্পর্কও ধরে নেয়া যায়, তারপরও চিটিং করার ব্যাপারটি যেন কিছুতেই খাপ খায় না।

 

বাংলাদেশের  নারী-পুরুষের বিবাহ-পূর্ব সম্পর্কটি হুয়াকে ঠিক বুঝিয়ে বলা যাবে না। তাছাড়া, ফাহিম যদি বলে,  ত্রিশ বছরের জীবনে সে অর্থে তাঁর কোন গার্লফ্রেন্ড ছিল না। তবে, হুয়া হয়তো হেসে ফেলবে, অথবা বিশ্বাসই করতে চাইবে না।

 

ফাহিম বলে, 'যখন তুমি কোন মানুষের সাথে কমিটেড থাকো, তখন চিটিং করা মানে গুরুতর অসততা, মানুষ হিসেবে তুমি তা করতে পারো না। ' ফাহিম তেমন কিছু না ভেবেই কথাগুলো বলে।

 

হুয়ার মুখ কুঁচকে যায়, অন্ত্র থেকে ঢেঁকুরে , না কি মানসিক কোন দহনে , ঠিক বোঝা যায় না। 

 

'কানাডায় আসার পর, জিয়ান বন্ধু-বান্ধব ডেকে এনে পার্টি শুরু করে। উইকেন্ডের দিনগুলোতেও। আমার ভালো লাগতো  কিনা, তা কখনো কেয়ার করে নি। আমাদের নিজস্ব সময়গুলো আর থাকে না। একই এপার্টমেন্টে থেকেও আমরা মনে হতো, আমরা আর কাপল নই।’

হুয়া একটু থামে । মুখ কুচকিয়ে ঢেঁকুর তুলে। তার পর , দু:খ প্রকাশ করে।

 

 ‘ আমি আন্দাজ করতে থাকি, জিয়ান হয়তো অন্য মেয়ের সাথেও ইনভলভড হয়ে গেছে। আমি বাইরে থেকে এসে , অ্যাপার্টমেন্টের এদিক-ওদকি চোখ চোখ বুলিয়ে দেখতাম, ঘরে অন্য কোন মেয়ের পোষাক, জুতা, মোজা, অথবা অন্তর্বাস পরে আছে কিনা।’ 

 

হুয়া কান্না আড়াল করার জন্যই যেনো একটু হাসে।

 

‘ গতমাসে হঠাৎ করে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে দেখি, জিয়ান আর একটি সাদা মেয়ে, এই সোফার উপর। জিয়ান সোফায় শুয়ে। সোনালী চুলের মেয়েটি উপরে। তালে তালে তাঁর বৃহৎ দুটি স্তন দুলছে।'

 

এক নাগাড়ে অনেকগুলো কথা বলে যায় হুয়া। হয়তো, বিয়ারের নেশায়।

 

হুয়া বলে যায়। ' আমি জিয়ানকে জিজ্ঞেস করি, কেন সে এটি আমার সাথে করলো। সে বলে, সে খুব দ্রুত একটা সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে গেছে। তাঁর আকাঙ্খার নিবৃত্তি হয় নি। সে আসলে জীবনকে উদ্দামভাবে উপভোগ করতে চায়। ফাহিম, তুমি বলো, এটি কি উপভোগ? উদ্দাম যৌন জীবন কি মানুষকে শান্তি এনে দিতে পারে?'

 

হুয়া আরেকটি বিয়ারের ক্যান খুলে চুমুক দেয়।

 

'জিয়ান আসলে ঠিক এমন ছিল না। সে সত্যি একদিন আমাকে ভালোবাসতো। আমার বাম ব্রেস্টের উপর একটা কলো তিল আছে। মিলিত হবার পর  আমরা যখন পাশাপাশি শুয়ে থাকতাম, জিয়ান হাত দিয়ে তিলটি স্পর্শ করতো। আর বলতো,  তোমার বুকের উপর এই তিলের শোভা - এ দৃশ্য শুধুই আমার।'

 

হুয়া বাম হাতে তাঁর বাম দিকের বুকের উপর হাত বুলায়।

 

' ইট ইজ রিয়েলি বিউটিফুল।  '

 

ফাহিম বুঝতে পারে, হুয়া পুরোপুরি মাতাল হয়ে গেছে। 

 

'তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না? দাঁড়াও তোমাকে দেখাই।'

 

হুয়া গলার দিক থেকে টিশার্ট সরিয়ে ডান দিকে ব্রার কিছু অংশ উন্মোচিত করে কালো তিলটি খুঁজে পায় না। হঠাৎ যেন বুঝতে পারে, তিলটি তাঁর বুকের বাম পাশে। সে বাম পাশের ব্রা খানিকটা সরায়। 'এইতো এখানে। সুন্দর না?'

 

বুকের উপরিভাগের সাদাত্বকের উপর মাঝারী এক কালো তিল, যেন কালো মুক্তার মতো আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফাহিম তিলের ইন্দ্রজালে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। এক শিহরণ,  ঠিক মাথা থেকে বুকের মধ্য দিয়ে তরঙ্গায়িত হয়ে, তাঁর জননাঙ্গকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়।

 

হুয়া আবার বিয়ারের ক্যানে চুমুক দেয়। হঠাৎ করে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। ' সময় কেন সব কিছু বদলে দেয়?'

 

এ প্রশ্নের উত্তর ফাহিমেরও জানা নেই। এ প্রশ্নের উত্তর তো সেও খুঁজছে। স্বাভাবিক সময়ে ফাহিম হয়তো, টেবিল থেকে টিস্যুপেপার নিয়ে হুয়ার দিকে এগিয়ে দিতো। হুয়াও হয়তো টিস্যু পেপার দিয়ে চোখ-নাক মুছে  বলতো, 'থ্যাংক ইউ। আই অ্যাম সরি। ' কিন্তু ফাহিম কিছুই করে না। হুয়া আরো একটু এগিয়ে এসে, তাঁর বুকের মাঝে মাথা রাখে। ফাহিম সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিমায় দুই হাত আলগোছে হুয়ার পিঠের উপর রাখে। এক সময় হুয়ার কান্না বন্ধ হয়। হুয়া দুই হাত দিয়ে ফাহিমকে জড়িয়ে ধরে। সে যেন এক শিশু,  ঘুমিয়ে পড়ার জন্য মায়ের কোল খুঁজছিল। 

 

এই বুঝি আলিঙ্গন! ফাহিম অনেকবার ভেবেছে, সে সাবিহাকে বিয়ের বাসরে জড়িয়ে ধরেছে। কিন্তু কখনোই সে আলিঙ্গনের অনুভূতির কথা ভাবে নি। কল্পনায় যে অনুভবটি থাকে , তার মাঝে কমতি থাকে । কিন্তু একজন পরিপূর্ণ নারী যখন প্রথমবারের মতো একজন যুবককে জড়িয়ে ধরে, সেটি ভিন্ন এক অনুভব। ভিন্ন এক শিহরণ। ফাহিম  হুয়ার নরম দু'টি বুকের স্পর্শ পায়।

 

ফাহিম অনুভব করে, তাঁর জননাঙ্গ ক্রমেই যেন শক্ত হয়ে উঠছে। তাঁর মনে হয়, হুয়া মাতাল হলেও, সেও বিষয়টি অনুভব করে । হুয়া হাত দিয়ে তা স্পর্শ করে।

 

ঠিকই তখনই ফাহিমের  অভ্যন্তরের কোন স্বয়ংক্রিয় বোধ  চালু হয়ে যায়। কিছু বুঝে উঠার আগেই সে হুয়াকে জিজ্ঞাসা করে, 'তুমি কি আমার জন্য ভালোবাসা অনুভব করছো?' 

ফাহিম ঠিক জানে না, কেমন করে ভালোবাসার বিষয়টি তাঁর  মাথায় ঢুকলো। হুয়া মাতাল হয়ে তাঁকে সেডিউস করছিল। হয়তো নিজের অজান্তে। এমন পরিস্থিতিতে, হয়তো আপতকালীন ভালোবাসা হতে পারে।  কিন্তু ফিল লাভ ফর মি? বাংলাদেশে সবাই বড় হয় শরীরকে ঘৃণা করে। ভালোবাসাহীন শারিরীক প্রেম বড় এক পাপ। এই বোধটি কি  অজান্তেই তাঁর মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে? ভালোবাসা এক বিপদজনক শব্দ। এই শব্দের অভ্যন্তরে এক ধরণের কারাগার থাকে। হুয়া ভালবাসায় আহত এক মানুষ। মূহুর্তেই যেন তাঁর নেশা কেটে যায়। ' লাভ?  নো-ও। আমি মিন , আই ডোন্ট নো !'

 

ঠিক তখনই ফাহিমের মোবাইল বেজে উঠে। আম্মার ফোন। ফোন কেটে দিয়ে, কল ব্যাক করে, একটু দূরে সরে গিয়ে আম্মার সাথে কথা বলে। ফাহিম বাসায় ফিরেছে কিনা, তা জানতে ফোন করেছে আম্মা। ফাহিম বলে, বাসায় গিয়ে ফোন করবে। ফোন কেটে দিয়ে সোফায় গিয়ে বসে সে।

 

কিন্তু মূহুর্তের সুতোটি যেন কেটে গেছে। এদিক ওদিক কিছু কথা হয় । অবশেষে, হুয়াকে বলে, অনেক রাত হয়েছে, ফিরতে হবে। হুয়া বলে, রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা বেশী। না হলে, সে ড্রাইভ করে তাঁকে পৌঁছে দিত। তারপর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে আসে। দরজার খোলার ঠিক আগে হুয়া জিজ্ঞেস করে, 'তোমার কি মনে হয়, আমি খুব খারাপ মেয়ে?'

 

ফাহিম হুয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে বেশ কিছুক্ষণ। তারপর বলে, ' তুমি টানহুয়া ফুলের মতোই বিশুদ্ধ। '

শেয়ার করতে চাইলে ....

কমেন্ট সমূহ:

কমেন্ট করুন: